মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যয়ে চট্টগ্রামে লাভ বাংলাদেশ পার্টির ৪র্থ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন

মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যয়ে চট্টগ্রামে লাভ বাংলাদেশ পার্টির ৪র্থ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন

দেশপ্রেম, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তা ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যয়ে যখন দেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা এক গভীর আত্মসমালোচনার মুখে দাঁড়িয়ে, তখন গণমানুষের অধিকার, জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব এবং তরুণদের ইতিবাচক রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রত্যাশাকে সামনে রেখে চট্টগ্রামে অনুষ্ঠিত হলো লাভ বাংলাদেশ পার্টির ৪র্থ প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও আলোচনা সভা।

সময়ের সেই টানাপোড়েন, সামাজিক বৈষম্যের চাপ এবং নৈতিক নেতৃত্বের সংকটের ভেতর এই আয়োজন কেবল একটি অনুষ্ঠান নয়—পরিণত হয় মানবিক রাষ্ট্রচিন্তা, জনমুখী রাজনীতি এবং ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রভাবনার এক উজ্জ্বল আলোকচিত্রে।

১৫ মে শুক্রবার বিকেল ৪টায় চট্টগ্রামের কাজির দেউরিস্থ এপোলো শপিং সেন্টারের ৩য় তলায় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাব-৩১ হল-এ বর্ণাঢ্য আয়োজন অনুষ্ঠিত হয়। চট্টগ্রাম মহানগর শাখার উদ্যোগে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানে শুরু থেকেই ছিল একদিকে আনুষ্ঠানিক গাম্ভীর্য, অন্যদিকে রাজনৈতিক কর্মী ও অতিথিদের স্বপ্নময়, উদ্দীপ্ত ও প্রাণবন্ত উপস্থিতি।

অনুষ্ঠানের সূচনা হয় পবিত্র কোরআন তেলাওয়াতের মাধ্যমে। তেলাওয়াত করেন হাফেজ মাওলানা আবু হুরায়রা। তেলাওয়াত শেষে পুরো সভাস্থলে এক ধরনের নীরব শ্রদ্ধা ও ভাবগম্ভীর পরিবেশ তৈরি হয়, যা পরবর্তী আলোচনা সভার জন্য এক আধ্যাত্মিক ও নৈতিক ভিত্তি তৈরি করে দেয়।

চট্টগ্রাম মহানগর সভাপতি আবদুল্লাহ মজুমদারের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আলোচনা সভা সঞ্চালনা করেন মহানগর সম্পাদক শাহজালাল। তাঁর দক্ষ সঞ্চালনায় পুরো অনুষ্ঠানটি শৃঙ্খলাবদ্ধ ও প্রাণবন্তভাবে এগিয়ে চলে।

অনুষ্ঠানের শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় সদস্য সেলিম উল্লাহ। তিনি সংগঠনের চার বছরের পথচলা ও রাজনৈতিক অঙ্গীকারের গুরুত্ব তুলে ধরে বলেন, এই দিনটি কেবল একটি প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী নয় বরং একটি আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক যাত্রার পুনঃউচ্চারণ।
অতিথি আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন দি ডেইলি ট্যুরিস্ট-এর ডেপুটি এডিটর কামাল উদ্দিন। তিনি সাংবাদিকতার নৈতিকতা ও দায়িত্বশীলতার প্রসঙ্গ তুলে ধরে সমাজ ও রাজনীতির মধ্যে স্বচ্ছতার গুরুত্ব নিয়ে কথা বলেন।

বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন সাংবাদিক ও নজরুল গবেষক ওচমান জাহাঙ্গীর, চ্যানেল এস-এর আবাসিক সম্পাদক মনির চৌধুরী এবং লাভ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশনের চিফ কো-অর্ডিনেটর আ ন ম তাজওয়ার আলম।

নিজ বক্তব্যে আ ন ম তাজওয়ার আলম লাভ বাংলাদেশের যাত্রাপথের ধারাবাহিক ইতিহাস তুলে ধরে বলেন, মানবিক ও জনকল্যাণমূলক স্বপ্নকে ধারণ করেই প্রথমে “লাভ বাংলাদেশ” একটি সামাজিক উদ্যোগ হিসেবে যাত্রা শুরু করে। পরবর্তীতে তা “লাভ বাংলাদেশ ফাউন্ডেশন”-এ রূপ নেয় এবং ধীরে ধীরে জনগণের অধিকার, ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রচিন্তা ও ইতিবাচক রাজনৈতিক পরিবর্তনের লক্ষ্যকে সামনে রেখে প্রতিষ্ঠিত হয় “লাভ বাংলাদেশ পার্টি”। তিনি বলেন, এই চার বছরের পথচলা শুধুই একটি রাজনৈতিক দলের বয়স নয়; বরং এটি মানুষের আশা, অধিকার, সংগ্রাম এবং মানবিক রাষ্ট্র নির্মাণের এক চলমান ইতিহাস।

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন প্রবীণ সাংবাদিক আ ফ ম বোরহান, সমাজকর্মী দিলরুবা শরিফ, শিশুসাহিত্যিক ও সব্যসাচী লেখক মোস্তফা হায়দার, কবি-সম্পাদক শওকত এয়াকুব, প্রতিবাদী ছড়াকার শফিকুল ইসলাম সবুজ এবং সাংবাদিক ইমরান সোহেল ও মৌলানা দ্বীন মোহাম্মদ রাব্বানী প্রমুখ। তাঁদের উপস্থিতি পুরো আয়োজনকে আরও বুদ্ধিভিত্তিক ও সাংস্কৃতিকভাবে সমৃদ্ধ করে তোলে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে বর্ষীয়ান সাংবাদিক ও লাভ বাংলাদেশ পার্টির চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান চৌধুরী বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতার কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, “আজ দেশের মানুষ প্রকৃত গণতান্ত্রিক অধিকার থেকে বঞ্চিত। রাজনীতির নামে বিভাজন, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতির সংস্কৃতি সমাজকে গভীর নৈতিক সংকটে ঠেলে দিচ্ছে। জনগণের কণ্ঠস্বর উপেক্ষা করে কখনোই টেকসই রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে ওঠে না।”

তিনি আরও বলেন, “যে রাজনীতি মানুষের মৌলিক অধিকার, ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে পারে না, সেই রাজনীতি শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার প্রতীক হয়ে দাঁড়ায়। তরুণ সমাজকে বিভ্রান্তিকর রাজনীতি থেকে বেরিয়ে এসে দেশপ্রেম, সততা ও আদর্শভিত্তিক নেতৃত্ব গড়ে তুলতে হবে।”

বক্তব্যের একপর্যায়ে তিনি বলেন, “আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে রাজনৈতিক পরিচয়ের আগে মানুষের পরিচয় বড় হয়ে উঠবে; যেখানে রাষ্ট্র হবে জনগণের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচারের আশ্রয়স্থল। লাভ বাংলাদেশ পার্টি সেই মানবিক রাষ্ট্রচিন্তার রাজনীতিকেই সামনে নিয়ে এগিয়ে যেতে চায়।”

আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য রাখেন জনতার ঐক্যের প্রধান সমন্বয়কারী আবদুল্লাহ আল মামুন, সাংবাদিক তুষার মুজিব, সাংবাদিক আমির হোসেন, কেন্দ্রীয় সদস্য মাওলানা নুর মোহাম্মদ, মিনহাজুল আবেদীন, জাহাঙ্গীর আলম ও মাওলানা গোলাম রাব্বানীসহ আরও অনেকে। তাঁরা প্রত্যেকেই দেশের রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতায় ন্যায়, সুশাসন এবং গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

অনুষ্ঠানে জনতার ঐক্যের হাসিনা বেগমসহ বিভিন্ন পর্যায়ের অতিথিরা উপস্থিত ছিলেন, যাদের অংশগ্রহণ পুরো আয়োজনকে আরও বিস্তৃত ও বহুমাত্রিক করে তোলে।

এছাড়া অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন কেন্দ্রীয় সদস্য ফিরোজ চৌধুরী, জনতার ঐক্যের হাবিবুর রহমান, আবু বকর সিদ্দিক শামীম, মুনতাসির, আমাদের চট্টগ্রাম মাল্টিমিডিয়ার সাংবাদিক নুরুল আজম, তৌকির উদ্দিন আনিস, মো. রমজান আলী, হিজবুল্লাহ মো. সুহাইব, মোশাররফ হোসাইন, মনি, মাওলানা ফজলুল করিম, সালামত উল্লাহসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমকর্মী, সামাজিক সংগঠক ও রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ।

বক্তারা সামগ্রিকভাবে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে সুশাসন, নৈতিক নেতৃত্ব এবং গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেন। তাঁরা বলেন, দায়িত্বশীল ও আদর্শভিত্তিক রাজনৈতিক চর্চা ছাড়া কোনো রাষ্ট্রেই দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা ও মানবিক উন্নয়ন সম্ভব নয়।
সভাপতির বক্তব্যে আবদুল্লাহ মজুমদার বলেন, “দেশ ও মানুষের কল্যাণে সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়াই আমাদের রাজনৈতিক অঙ্গীকার। বৈষম্যহীন, মানবিক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।”

সবশেষে দীর্ঘ আলোচনা, মতবিনিময় ও ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক পরিকল্পনার প্রত্যয়ে এক নতুন রাজনৈতিক উদ্দীপনা নিয়ে অনুষ্ঠানের পরিসমাপ্তি ঘটে।

অতিথিদের আন্তরিক আপ্যায়ন ও সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশে শেষ হয় এই বর্ণাঢ্য আয়োজন, যা মানবিক রাষ্ট্রচিন্তার রাজনীতিকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার এক দৃঢ় অঙ্গীকারে পরিণত হয়।

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email