আহলা দরবার শরীফের প্রাণপুরুষ হাদীয়ে জামান হযরত সৈয়দ আবু জাফর মুহাম্মদ সেহাবউদ্দীন খালেদ (রহ:) : আলমগীর রানা

আহলা দরবার শরীফের প্রাণপুরুষ হাদীয়ে জামান হযরত সৈয়দ আবু জাফর মুহাম্মদ সেহাবউদ্দীন খালেদ (রহ:)
আলমগীর রানা

বাংলাদেশে সুন্নিয়ত তথা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতকে যিনি নিজের প্রাণের চেয়েও বেশি ভালো বাসতেন, তিনি বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনার প্রতিষ্ঠাতা, চট্টগ্রামের বোয়ালখালীস্থ আহলা দরবার শরীফের সাজ্জাদানশীন, সুলতানুল মোনাজেরীন, হাদীয়ে জামান, হযরতুল আল্লামা শাহসুফী মাওলানা আলহাজ্ব সৈয়দ আবু জাফর মুহাম্মদ সেহাবউদ্দীন খালেদ আল-কাদেরী আল-চিশতী (রহ:)।
আগামীকাল ৫ এপ্রিল রবিবার তাঁর ১৫তম পবিত্র বার্ষিক ওরশ মোবারক।

সংক্ষিপ্ত জীবনী: ১৯৫১ সালে ১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের বোয়ালখালীস্থ আহলা দরবার শরীফে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতা আহলা দরবার শরীফের আধ্যাত্মিক সাধক, হাযত রওয়া, মুশকিল কোশা, রুহুল আশেকীন, সুলতানুল মোনাজেরীন, হযরতুল আল্লামা শাহসুফী আবুল মোকারেম মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম (রহ.) প্রকাশ-নুরী বাবা তিনি হযরত গোলামুর রহমান (প্রকাশ-বাবা ভান্ডারী) এঁর সুযোগ্য খলিফা এবং তিনি মাইজভাণ্ডার শরীফের গোড়াপত্তনকারী গাউসুল আজম হযরত শাহসুফী মাওলানা সৈয়দ আহমদ উল্লাহ (ক.) প্রকাশ- হযরত কেবলার আধ্যাত্মিক শিষ্য, আহলা দরবার শরীফের প্রাণ পুরুষ, কুতুবে জমান হযরত শাহসুফি মাওলানা জনাব কাজী আছাদ আলী (ক.) এঁর জ্যেষ্ঠ পৌত্র (নাতি)।

শিক্ষা জীবন: শিক্ষা জীবনে তিনি নগরীর চন্দনপুরা দারুল উলুম মাদ্রাসা থেকে কামিল ও চট্টগ্রাম কলেজ থেকে রাজনীতি বিজ্ঞান বিষয়ে অনার্সসহ মাস্টার্স ডিগ্রি সম্পন্ন করেন। তাঁর লেখাপড়া জীবনে বিশেষ একটি বৈশিষ্ট্য ছিলো, তিনি প্রত্যেক শ্রেণীতে প্রথম স্থান অর্জন করেছেন। পিতার আধ্যাত্মিকতায় মজে জীবনের এক পর্যায়ে তাঁর কাছে শিষ্যত্ব (বায়াত) গ্রহণ করেন।

খেলাফত প্রাপ্তি: হযরত গোলামুর রহমান প্রকাশ-বাবা ভাণ্ডারী (ক.) এঁর সুযোগ্য খলিফা এবং জনাব কাজী আসাদ আলী সাহেব কেবলা (রহ.) এঁর বংশের অন্যতম আধ্যাত্মিক সিদ্ধপুরুষ, বিশিষ্ট মোনাজের ও ত্বরিকত প্রচারক হযরত শাহসূফী মাওলানা আবুল মোকারেম মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম আলকাদেরী, আল-চিশতী সাহেব কেবলা (রহ.) ১৯৭৬ সালের ১৪ ডিসেম্বর, ২৮ অগ্রহায়ণ ভোর ৬টা ২মিনিটে বেছাল প্রাপ্ত হন। নুরীবাবা (রহ:) ওফাতের পূর্বে তিনি স্বীয় জ্যেষ্ঠ পুত্র, সুযোগ্য উত্তরাধিকারী মাওলানা সৈয়দ আবু জাফর মোহাম্মদ সেহাবউদ্দীন খালেদ সাহেব কেবলা (মাঃজিঃআঃ) কে খেলাফত দান করেন। পিতার বেছালের পর থেকে তিনি প্রিয় হাবিব রাসুল পাক হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এঁর প্রেম ও আদর্শ শিক্ষা দিয়ে যান। তিনি আল্লাহর দ্বীন ও তরিকতের খেদমতে নিজের পূর্ণজীবন উৎসর্গ করে গেছেন। অলি-আল্লাহ ও মুরশিদের প্রতি ভক্তদেরকে আধ্যাত্মিক শিক্ষা-দীক্ষা দিয়ে গেছেন।

তিনি সুন্নিয়তের একক অরাজনৈতিক সংগঠন হিসেবে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রসেনা প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে সে সংগঠন সারা বাংলাদেশব্যাপি অহিংস ছাত্র রাজনীতির মডেল হিসেবে রূপ নেয়। পরে ইসলামী ফ্রন্ট বাংলাদেশ নামে একটি রাজনৈতিক দল গঠন করা হয়; কোরআন ও সুন্নী মতাদর্শ ভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে। সুন্নীয়তের প্রতিটি আন্দোলনে তাঁর নেপথ্য ভূমিকা ছিলো অগ্রণী। তিনি আহলা দরবার শরীফের সাজ্জাদানশীন থাকাকালীন সময়ে প্রতিষ্ঠা করেন, তরিকত ভিত্তিক সংগঠন আঞ্জুমানে আসাদীয়া নূরীয়া সেহাবীয়া ও খানকায়ে কাদেরীয়া চিশতিয়া নুরীয়া সেহাবীয়া। নিজ এলাকাকে ইসলামের আলোয় আলোকিত করার জন্য প্রতিষ্ঠা করেন, আসাদীয়া নূরীয়া সেহাবীয়া দাখিল মাদ্রাসা। জনসাধারণের যাতায়াতের সুবিধার্থে নিজের ব্যক্তিগত উদ্যোগে চট্টগ্রাম-কক্সবাজার আরাকান সড়কখ্যাত মূল রাস্তা থেকে আহলা দরবার শরীফ (মঞ্জুরহাট খোলা তথা মুকুন্দ রামের হাট) বাস স্টেশন হয়ে দরবার শরীফ পর্যন্ত সড়কের প্রভূত উন্নতি সাধিত করে চট্টগ্রাম শহরের বহদ্দারহাট বাস টার্মিনাল থেকে দরবার শরীফ পর্যন্ত ‘আহলা দরবার শরীফ বাস সার্ভিস’ চালু করেন। বোয়ালখালীর শাকপুরায় আরাকান সড়ক সংলগ্ন তাঁর নামে একটি তোরণ নির্মাণ করেন ২০০৪ সালে।

তিনি সামা মাহফিল করতে এবং শুনতে বেশী পছন্দ করতেন। সেমা চলাকালীন সময়ে জজবা হালতে নিজে যেমন কাঁদতেন, তেমনি ভক্তদেরকে কান্নার জলে ভাসাতেন। সিজদা, সামা, কেয়াম ও দরুদ এর পক্ষে যৌক্তিক দলিল উপস্থাপন সহকারে তা বয়ান করতেন ভক্তদের মাঝে। তাঁর সহচার্যে এসে তাঁর কাছে বায়াত গ্রহণ করে অনেক বিপথগামী লোক সঠিক পথে ফিরে এসেছেন। ইমামে আহলে সুন্নাত, হাদীয়ে জামান আল্লামা সেহাবউদ্দিন খালেদ (রহ:) ভক্ত-মুরীদদের সাথে আধ্যাত্মিক আলোচনায় মশগুল থাকতেন সব সময়। আল্লাহ ও আল্লাহর রাসুল আহমদে মোস্তবা মুহাম্মদ মোস্তফা (দ.), সাহাবাগণ, পীরানে পীর দস্তগীর হযরত বড়পীর মীর মহিউদ্দীন আবদুল কাদের জিলানী (রহ.), খাজায়ে খাজেগান হিন্দলওলী হযরত খাজা গরীবে নেওয়াজ মঈনুদ্দীন চিশতী আজমেরী ছেনজেরী ও প্রখ্যাত পীর-মাশায়েখদের কথা বলতেন। ভক্তরা মুগ্ধ হয়ে তা শুনতেন। দরবারে গিয়ে তাঁকে কাছ থেকে এক নজর দেখার জন্য ভক্তরা ঘন্টার পর ঘন্টা লাইন ধরে অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেন।

আহলা দরবার শরীফের ওরশ সমূহ: হযরত কেবলা (কঃ) এঁর জাহেরী নির্দেশে জনাব কাজী আসাদ আলী (রহ.) এঁর আমল থেকে প্রতি বছর ২৩ ফাল্গুন ওরশ শরীফ, ২৯ বৈশাখ জনাব হযরত কাজী আছাদ আলী কেল্লা (রহ.) এঁর এবং ২৭ অগ্রহায়ণ হযরত নূরী বাবা (রহ.) এঁর বেছাল শরীফ এবং ২২ চৈত্র মোতাবেক ৫ এপ্রিল আহলা দরবার শরীফের সাজ্জাদানশীন, পীরে ত্বরিকত, হাদীয়ে জামান হযরতুল আল্লামা শাহসূফী আলহাজ্ব সৈয়দ আবু জাফর মুহাম্মদ সেহাবউদ্দীন খালেদ আলকাদেরী আল-চিশতী (রহ:) এঁর বেছাল শরীফ উপলক্ষে আহলা দরবার শরীফে মহাসমারোহে ওরশ শরীফ অনুষ্ঠিত হয়। এছাড়া শবে-বরাত, শবে-কদর, আশুরাসহ প্রতি আরবী চন্দ্র মাসের ১০ তারিখ দিবাগত রাত হযরত গাউসে পাক (রহ.) এঁর এবং রজব মাসের ৫ তারিখ দিবাগত রাতে হযরত খাজা গরীবে নেওয়াজ (রহ.) এঁর ওরশ শরীফ এবং অন্যান্য ধর্মীয় দিবস সমূহ যথাযথ ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদির মাধ্যমে সম্মানের সাথে পালন করা হয়।

আহলা দরবার শরীফের অন্যতম অলিয়ে কামেল, ইমামে আহলে সুন্নাত, হাদীয়ে জামান হযরতুল আল্লামা শাহসুফী মাওলানা আলহাজ্ব সৈয়দ আবু জাফর মোহাম্মদ (এ. জেড, এম) সেহাবউদ্দীন খালেদ আল-ক্বাদেরী, আল্-চিশতী সাহেব কেবলা (রহ:) এঁর ১৫তম পবিত্র বার্ষিক ওরশ শরীফ ২২ চৈত্র মোতাবেক ৫ এপ্রিল রবিবার চট্টগ্রামের বোয়ালখালীস্থ আহলা দরবার শরীফে মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হবে। এদিন রাত ১০ টায় হযরত সেহাব বাবা (রহ:) এঁর মাজার শরীফে গিলাফ চড়ানো হবে।

লেখক: সংগঠক, সাংবাদিক-প্রাবন্ধিক

Share on facebook
Facebook
Share on twitter
Twitter
Share on linkedin
LinkedIn
Share on whatsapp
WhatsApp
Share on email
Email