
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক
প্রজ্ঞার প্রস্থান, আলোর উত্তরাধিকার
আবদুল্লাহ মজুমদার
কিছু মানুষের মৃত্যু কেবল একটি জীবনের অবসান নয়; একটি চিন্তার যুগেরও অবসান। তাঁদের প্রস্থান আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও নৈতিক সাহসের মানুষ ক্রমেই বিরল হয়ে উঠছেন। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক ছিলেন তেমনই এক মনীষী, যিনি নিভৃতে থেকেও আলোকিত করেছেন বাংলাদেশের সাহিত্য, সমাজ ও রাষ্ট্রচিন্তার পরিসর। তাঁর কলম কখনো ক্ষমতার অনুগত হয়নি, কখনো জনমোহিনী জনপ্রিয়তার পেছনে ছুটেনি; বরং সত্য, যুক্তি ও মানবিক মূল্যবোধের পক্ষেই ছিল অবিচল। তাঁর প্রয়াণে বাংলাদেশের বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গন হারাল এক সংযমী কিন্তু দীপ্তিমান আলোকবর্তিকাকে।
১৯৪০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর কিশোরগঞ্জের পাকুন্দিয়া উপজেলায় তাঁর জন্ম। ময়মনসিংহ জিলা স্কুল ও আনন্দমোহন কলেজে পড়াশোনা শেষে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। পরবর্তী সময়ে একই বিভাগে দীর্ঘদিন অধ্যাপনা করেন এবং বিভাগীয় চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষক হিসেবে তিনি কেবল পাঠদানেই সীমাবদ্ধ ছিলেন না; শিক্ষার্থীদের স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে, প্রশ্ন করতে এবং যুক্তির আলোয় সত্য অনুসন্ধানে উদ্বুদ্ধ করতেন।
২০২৪ সালের অক্টোবরে তিনি বাংলা একাডেমির সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০২৬ সালের ৫ জুলাই রাজধানীর মিরপুরে অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে নেওয়ার পর তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স হয়েছিল ৮৫ বছর।
অধ্যাপক ফজলুল হকের চিন্তার পরিসর ছিল বিস্ময়করভাবে বহুমাত্রিক। সাহিত্য ছিল তাঁর প্রধান অন্বেষণের ক্ষেত্র; তবে ইতিহাস, দর্শন, সমাজ, রাষ্ট্র, শিক্ষা, অর্থনীতি ও সভ্যতার সংকট নিয়েও তিনি গভীরভাবে লিখেছেন। তাঁর বিশ্বাস ছিল, সাহিত্য কেবল নান্দনিকতার বিষয় নয়; এটি মানুষের মুক্তি, সমাজের বিবেক এবং জাতির আত্মপরিচয় নির্মাণের অন্যতম শক্তিশালী মাধ্যম।
তিনি প্রচারের আলো থেকে সচেতনভাবেই দূরে থেকেছেন। তাঁর কাছে একজন চিন্তকের প্রকৃত পরিচয় ছিল তাঁর রচনায়। ব্যক্তিজীবনে ছিলেন সংযমী, নিরহংকার ও অধ্যবসায়ী। তাঁর ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার ছিল দেশি-বিদেশি সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস ও সমাজবিজ্ঞানের অসংখ্য মূল্যবান গ্রন্থে সমৃদ্ধ। পাঠ, গবেষণা ও মননচর্চাই ছিল তাঁর আজীবনের সাধনা।
বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর গবেষণা যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি রাষ্ট্রচিন্তা, জাতীয়তাবাদ, শিক্ষা ও সমাজ-রাজনীতি বিষয়ক প্রবন্ধও সমানভাবে সমাদৃত। তিনি লোকায়ত ও সুন্দরম সাময়িকপত্র সম্পাদনা করেছেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে কালের যাত্রার ধ্বনি, আশা আকাঙ্ক্ষার সমর্থনে, বাঙালির জাতিসত্তা এবং সাহিত্যচিন্তা। এ ছাড়া সাহিত্য, সমাজ, রাষ্ট্র ও সংস্কৃতি নিয়ে তাঁর আরও বহু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে।
প্রবন্ধ ও গবেষণায় অসামান্য অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কারসহ বিভিন্ন সম্মাননায় ভূষিত হন। তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় কোনো পদ বা পুরস্কারে নয়; তাঁর পরিচয় তাঁর মনন, সততা এবং মুক্তচিন্তার প্রতি আজীবন অঙ্গীকারে।
ব্যক্তিজীবনেও তিনি গভীর বেদনার সাক্ষী। ২০১৫ সালে তাঁর পুত্র, প্রকাশক ফয়সল আরেফিন দীপনের নির্মম হত্যাকাণ্ড তাঁকে শোকাহত করেছিল। কিন্তু সেই শোক তাঁর বিশ্বাসকে টলাতে পারেনি। প্রতিহিংসার বদলে তিনি বেছে নিয়েছিলেন সহনশীলতা, যুক্তিবাদ ও মানবিকতার পথ। এটাই ছিল তাঁর চরিত্রের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিকগুলোর একটি।
অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক বিশ্বাস করতেন, একটি জাতির প্রকৃত শক্তি তার অর্থনৈতিক সমৃদ্ধিতে নয়; বরং জ্ঞানচর্চা, নৈতিকতা, মুক্তবুদ্ধি ও সংস্কৃতির বিকাশে নিহিত। তাঁর সমগ্র জীবন সেই বিশ্বাসেরই এক নিরলস অনুশীলন।
সময় একদিন সব নামকে ইতিহাসে পরিণত করে, কিন্তু খুব কম মানুষই ইতিহাসের ভেতরে চিন্তার স্থায়ী ঠিকানা নির্মাণ করতে পারেন। অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক তাঁদেরই একজন। তিনি আর নতুন কোনো বই লিখবেন না, নতুন কোনো বক্তৃতায় আমাদের ভাবাবেন না; কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া চিন্তা, রচনা ও মূল্যবোধ আমাদের বৌদ্ধিক অভিযাত্রার সঙ্গী হয়ে থাকবে। যতদিন বাংলা ভাষা, মুক্তবুদ্ধি ও মানবিক সমাজের স্বপ্ন বেঁচে থাকবে, ততদিন তাঁর নামও উচ্চারিত হবে গভীর শ্রদ্ধায়—প্রজ্ঞার এক অনিঃশেষ আলোকবর্তিকা হিসেবে।
লেখক: নির্বাহী সম্পাদক, বাণিজ্যিক রাজধানী।





