
রমেশ ফকির মাইজভারী (প্রকাশ- রমেশ শীল) কি হিন্দু না মুসলিম?
আলমগীর রানা
[একুশে পদকপ্রাপ্ত উপমহাদেশের প্রখ্যাত কবিয়াল রমেশ শীল (ফকির) মাইজভাণ্ডারী (রহ:) এঁর ১৪৯ তম জন্ম উৎসব উপলক্ষে আজ (৯ মে) শনিবার বোয়ালখালীর পূর্ব গোমদণ্ডীতে অবস্থিত কবিয়াল রমেশ শীল সমাধি সৌধ এ অনুষ্ঠেয় আয়োজন উপলক্ষে তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করছি। নিম্নে তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনী তুলে ধরা হলো।]
প্রথম মাইজভান্ডার গমন : ১৯২৩ সালে প্রতিবেশীদের সাথে প্রথম মাইজভান্ডার দরবার শরীফে গমন করেন, যা রমেশ শীলের জীবনে এক আমূল পরিবর্তন এনে দেয়। প্রথম সাক্ষাতেই তিনি বাবা ভান্ডারীর নজরে পড়েন এবং বাবাজান কেবলা নিজ হাত মোবারক দিয়ে তবারুক খাইয়ে দেন। এরপর থেকেই শুরু হয় রমেশের মাইজভান্ডারী দর্শনের পথে যাত্রা। রমেশের নিজ উক্তি অনুযায়ী, তবারুক খাওয়ার পর যেন কেউ তাকে বলছিলেন— “রমেশ, তুমি লিখ; মাইজভান্ডারীরা তোমার গান শুনতে চায়।” পরবর্তীতে বাবাজান কেবলার অশেষ রহমতে তিনি ত্বরিকায়ে মাইজভান্ডারী প্রচার ও প্রসারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর গানের মূল বিষয় ছিল মুর্শিদপ্রেম, যা মানুষের হৃদয়কে গভীরভাবে প্রভাবিত করত। তিনি তাঁর লিখিত গানের জন্য অসংখ্য পুরস্কার লাভ করেন, যার মধ্যে অন্যতম হলো একুশে পদক।

রমেশ ফকির এঁর জাহেরী কলেমা তলকিন : হযরত বাবা গোলামুর রহমান মাইজভান্ডারী (রহ:) এঁর ইন্তেকালের পরে একদা ১৯৪২ সালের ৫ এপ্রিল ২২শে চৈত্র ওরশ শরীফে যান রমেশ ফকির। এতে তিনি মুসলিম এক ফকিরের দলে গিয়ে বসেন। মুসলিম ফকিরগণ তাঁকে “নাপিতার ছেলে” বলে ধিক্কার দিল এবং তাদের থেকে তাঁকে বের করে দেন। তাঁকে গানও করতে দেয়নি, তাতে রমেশ ফকির মনে খুবই আঘাত পান এবং বাবা ভান্ডারীর (রহ:) মাজারে গিয়ে ঐদিন সারারাত মনের আবেগে দুই চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে ক্রন্দন করতে করতে বার বার বলতে লাগলেন, বাবা ভান্ডারী (রহ:) আপনার পাক জবানে কলমা তলকিন দিয়ে আমাকে আপনার স্ব-জাতে দীক্ষিত করুন। এমতাবস্থায় বাবা ভান্ডারী (রহ:) এঁর রওজা শরীফ হতে স্পষ্ট আওয়াজ আসল, যা রমেশ ফকির স্পষ্ট কানে শুনে যে, “হে রমেশ তুমি কি জান না! বহুকাল পূর্বে আমি তোমাকে আমার স্বজাতে গ্রহণ করে নিয়েছি। তবু তুমি মনক্ষুন্ন করছ কেন? তবে তোমার যদি একন্ত ইচ্ছা হয় চট্টগ্রামের রাঙ্গুনীয়া থানার কাউখালিতে আমার একনিষ্ঠ ভক্ত হযরত মাওলনা সিরাজুল হক মাইজভান্ডারী (রহ:) আছে। তাঁর কাছে গিয়ে জাহেরী কলেমা পড়ে তলকিন গ্রহণ করে তাঁর নির্দেশ মতো বাকী জীবন পরিচালনা কর।”
এরপর তিনি সেই বৎসর ১৯৪২ সালের এক শুভদিনে চট্টগ্রাম রাঙ্গুনিয়া থানার কাউখালী নিবাসী বাবা ভান্ডারীর (রহ:) এঁর ভক্ত ও খলিফা হযরত মৌলানা সিরাজুল হক সাহেবের কাছে যান এবং বাবা ভান্ডারীর (রহ:) এঁর আধ্যাত্মিক নির্দেশ ও হুকুমের কথা বর্ণনা করেন। মাওলানা নিরবে তাঁর কথা শুনেন এরপর জবাব দেন বাবা ভান্ডারী (রহ:) তোমাকে তলকিন গ্রহণের হুকুম করেছেন সত্য, সে মতে তুমি আমার কাছে আসা যাওয়া কর কিন্তু বাবা ভান্ডারী (রহ:) আমাকে হুকুম করে বলতে হবে, তোমাকে তলকিন দেওয়ার জন্য। যে পর্যন্ত তিনি আমাকে হুকুম না করেন, সে পর্যন্ত আমি তোমাকে তলকিন দিতে পারব না।
১৯৪২ইং হতে ১৯৪৫ ইংরেজী পর্যন্ত তিন বৎসর তিনি উক্ত মাওলানার ছোহবতে আসা যাওয়া করার পর ১৯৪৬ সালের জানুয়ারী মাসে একদা সন্ধ্যা বেলা রমেশ ফকির পীর মাওলানা সিরাজুল হক ছাহেবের বাড়ীতে যান। রমেশকে দেখে মাওলানা সাহেব বললেন রমেশ তুমি আজ ক্ষৌর কার্য করে গোসল করে পরিস্কার হয়ে সন্ধ্যায় মাগরিবের নামাজের পরে আমার হুজরায় আসবে। সে মতে রমেশ ফকির গেলেন, সন্ধ্যার পর মাওলানা রমেশ ফকিরকে জাহেরী তলকিন করে স্ব-জাতে দীক্ষা প্রদান করেন এবং তৎ সময়ে রমেশকে উদ্দেশ্য করে মাওলানা বলেন “রমেশ তুমি ভাল করে জেনে নাও ও বুঝে নাও তোমাকে এ- তলকিন আমি পাঠ করাচ্ছি না। বিশ্বাস কর আমাকে স্বাক্ষী করে স্বয়ং হযরত বাবাভান্ডারী (রহ:) তোমাকে তলকিন পাঠ করাচ্ছেন এবং বাবাভান্ডারী (রহ:) এর কাছে তুমি তলকিন নিচ্ছ। আজ হতে তুমি বাবাভান্ডারী (রহ:) স্ব- জাতে দ্বিক্ষীত ইহ-পরকালে তোমার আর কোন চিন্তা ও ভয় নেই। হার ওয়াক্ত তুমি বাবাভান্ডারীর নাম স্বরণ করে চলবে” এরপর হতে রমেশ ফকির তাঁর প্রতি অধিক ভক্তি অনুরক্ত হয়ে পড়েন। এরপর মাওলানা সিরাজুল হক ছাহেবকে তাঁর নাম পরিবর্তন করার অনুরোধ করলে তিনি বলেন “আজ থেকে তোমার নাম “রমেশ ফকির”।

রমেশ ফকির মাইজভাণ্ডারীর কামেলিয়ত ও দেহত্যাগের ঘটনা : রমেশ ফকির মাইজভাণ্ডারী তাঁর মুর্শিদ হযরত গাউসুল আযম গোলামুর রহমান মাইজভাণ্ডারী (রহ.) বাবাজান কেবলার কাছ থেকে এমন কামেলিয়ত অর্জন করেছিলেন যে, তিনি নিজের জবানেই বিদায়ের সময় নির্ধারণ করে যান। বাবাজানের বেছাল শরীফ ছিল ২২ চৈত্র।
রমেশ শীল বলেছিলেন, “আমি যাবো ২৩ চৈত্র।” সত্যিই যেমন কথা, তেমন কাজ—২৩ চৈত্র তিনি দেহত্যাগ করেন। গুরূজী রমেশ শীলের মহান জ্ঞানভাণ্ডার ও রচনাবলী কেয়ামত পর্যন্ত অমর হয়ে থাকবে। শ্রী রমেশ শীল যখন দেহত্যাগ করেন, তখন তাঁর মৃতদেহ নিয়ে দ্বন্দ্বের সৃষ্টি হয়। রমেশ শীলের স্বজাতিরা তাঁর মৃতদেহ দাহ (পুড়িয়ে ফেলা) করার দাবি জানায়। অপরদিকে তাঁর মুর্শিদের দরবার, অর্থাৎ মাইজভাণ্ডার শরীফ দরবার-এর সাধুজনেরা দাফনের প্রস্তাব দেন, কারণ মহাসাধক রমেশ ছিলেন মাইজভাণ্ডার দরবারের একজন শিষ্য। লাশ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে আলোচনা চলতে থাকে। আলোচনার এক পর্যায়ে মাইজভাণ্ডার দরবারের সূফিগণ প্রস্তাব দেন—যেহেতু রমেশ আমাদের সঙ্গী, তাই তাঁর উপর আমাদেরও অধিকার রয়েছে। সুতরাং প্রথমে আমাদের দাফন কার্য সম্পাদন করতে দাও, তারপর তোমরা তোমাদের নিয়ম পালন করবে। কারণ আগে পুড়িয়ে ফেললে দাফনের সুযোগ থাকবে না, কিন্তু দাফনের পর তোমাদের কাজ করার সুযোগ থাকবে। হিন্দুরা এই শর্তে রাজি হয়। অতঃপর তাঁর মুর্শিদের পক্ষের লোকেরা দাফন কার্য সম্পন্ন করে দরবারে ফিরে যান এবং হিন্দুদেরকে তাদের কাজ করার কথা বলে আসেন। পরবর্তীতে যখন তাঁরা পোড়াবার প্রস্তুতি গ্রহণ করে কবর খনন করেন, তখন দেখতে পান কবরের ভিতরে একটি গোলাপ ফুল পড়ে আছে; কিন্তু সেখানে রমেশ শীলের দেহ আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।
ইন্তেকালের পরে বাড়ীতে আগমন : রমেশ ফকির ইন্তেকালের পরে তাঁর স্ত্রী গর্ভবতী হয়ে পড়েন। এ ঘটনা দেখে হিন্দু সমাজের লোকেরা সন্দেহ প্রকাশ করে এবং বিচার বা শালিস বসায়। তারা রমেশের স্ত্রীকে অপবাদ দিয়ে “কলঙ্কিনী” বলে আখ্যা দেয় এবং তাকে গ্রাম ও সমাজ থেকে বের করে দেয়। তখন তাঁর স্ত্রী বলেন, “আমার স্বামী রমেশ শীল রাতে আমার কাছে আসেন।” গ্রামবাসী তাঁর কথা বিশ্বাস না করে তাকে সমাজচ্যুত করে। পরে তিনি আবার বলেন, “আজ রাতেও তিনি আসবেন, আপনারা এসে দেখুন।” গ্রামের মাতব্বররা তাঁর কথা মেনে নিয়ে সেই রাতে পরীক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেয়। গভীর রাতে তারা পাহারা দিতে থাকে। তখন তারা দেখল—ফকির রমেশ আসার পর হঠাৎ তাকে ধরতে গেলে তিনি অদৃশ্য হয়ে যান। এই ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করার পর গ্রামের অনেক মাতব্বর ও লোকজন বিস্মিত হন এবং পরবর্তীতে তারা রমেশ শীল–এর মাধ্যমে গাউছুল আজম মাইজভান্ডারী–এর দরবারে গিয়ে বায়আত গ্রহণ করেন।
লেখক: সাংবাদিক, সংগঠক ও প্রাবন্ধিক।
দৈনিক ঘোষণা- বোয়ালখালী উপজেলা প্রতিনিধি, চট্টগ্রাম।
সম্পাদক ও প্রকাশক, সাপ্তাহিক বাণিজ্যিক রাজধানী ও
banijjikrajdhani.com





