
এই নিষ্ঠুরতা ও সহিংসতার চর্চা বন্ধ হোক
সৈয়দ আবু মকসুদ
সাধারণত ছোট শিশু ও আদুরে প্রাণীদের কষ্ট আমি সহ্য করতে পারি না। কারণ একটাই—এরা মুখ খুলে নিজেদের কষ্টের কথা বলতে পারে না। এ জন্য কোনো শিশু বা প্রাণীর অসুস্থতাও আমাকে প্রচণ্ড যন্ত্রণা দেয়। কারণ তার কাছ থেকে জানা যায় না—ঠিক কোথায় তার কষ্ট, কী ধরনের কষ্ট সে অনুভব করছে। আর অসুস্থতার বদলে যদি হয় নির্মম নির্যাতন, তাহলে তা তো কল্পনাই করা যায় না।
নরসিংদীতে গত ২৪ জুন কয়েকজন মানুষ মিলে একটি কুকুরের গলায় ইট বেঁধে পানিতে ফেলে দিয়েছে। ভিডিওতে দেখা যায়, কুকুরটি ধীরে ধীরে পানিতে ডুবে মারা গেছে সবার সামনেই। এই দৃশ্য কি শুধু একটি কুকুরের মৃত্যুর ঘটনা? না, এটি মানুষের ভেতরে লুকিয়ে থাকা নিষ্ঠুরতার এক ভয়ংকর প্রকাশ।
এই বিষয়টি নিয়ে কথা বলাও অনেকের কাছে হাস্যকর মনে হয়। তারা ভাবে, “মানুষ মানুষকে মেরে ফেলছে, আরেকজন এসে পশুর জন্য মায়া দেখাচ্ছে!” কিন্তু বিষয়টি শুধু মানুষ ও প্রাণীর পার্থক্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কারণ প্রাণীর প্রতি ইচ্ছাকৃত এমন নিষ্ঠুরতা মানুষের প্রতি ভবিষ্যৎ সহিংস আচরণেরও একটি সতর্ক সংকেত।
এ কারণেই এটিকে শুধু “একটি প্রাণীর ক্ষতি” হিসেবে দেখার কোনো সুযোগ নেই। বরং এটি সমাজের জন্য বিপজ্জনক এক মানসিকতার প্রাথমিক লক্ষণ হিসেবেও বিবেচনা করা উচিত। একজন মানুষ যখন একটি অসহায় প্রাণীর ওপর নির্মম হতে পারে, তখন সেই নিষ্ঠুরতাকে “এটা তো শুধু একটি কুকুর” বলে এড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়। কারণ নিষ্ঠুরতা কখনো একটি জায়গায় থেমে থাকে না। শুরুতেই তা প্রতিরোধ করা না গেলে একসময় সেই নিষ্ঠুরতা মানুষের দিকেও ফিরে আসে, যার নজির আমরা বারবার দেখেছি।
মাগুরার শিশু আছিয়া, ঢাকার শিশু রামিসা এবং সদ্য লক্ষ্মীপুরের রায়পুরে একই পরিবারের তিন মেয়েকে গলা কেটে হত্যাচেষ্টার মতো ভয়াবহ ঘটনাগুলো সেই নির্মম মানসিকতারই প্রমাণ বহন করে।
একটি সভ্য সমাজের পরিচয় শুধু মানুষ মানুষের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করে, তা দিয়ে নির্ধারিত হয় না; বরং তারা নিষ্পাপ প্রাণীদের সঙ্গে কেমন আচরণ করে, সেটিও সেই সমাজের মানবিকতার বড় পরিচয়।
আজ একটি কুকুরের গলায় ইট বেঁধে ডুবিয়ে মারার মতো নিষ্ঠুরতাকে যদি আমরা স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে মেনে নিই, তাহলে শুধু প্রাণীই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, ক্ষতিগ্রস্ত হবে আমাদের নিজেদের মানবিকতাও।
তাই প্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতাকে আমরা যতটা সহজভাবে দেখি, বিষয়টি আসলে সমাজের জন্য ততটা সহজ নয়। এই সহজ সত্যটি আসুন আমরা সবাই বুঝি। নইলে বিপদ আর বাইরে থাকবে না; হয়তো একদিন তা আমাদের ঘরের কাছেই এসে দাঁড়াবে।





